সেদিন থেকে দুলাভাই আমার বেডরুমের সঙ্গি, তারপর যা হয়……(বিস্তারিত)

ঘটে গেল নীরবেই

অবনি, এই অবনি নাস্তাটা শেষ করে যা অস্থির কণ্ঠে বলে উঠল লাবণ্য। ব্যস্ত হাতে মেয়ের ব্যাগ গোছাতে গোছাতে আরেকবার ডাক দিল সে।
লাবণ্য আমার রুমাল বেডরুম থেকে ডাক এলো রিয়াদের। সকাল হলেই লাবণ্যর কান্না পায়, যেমন মেয়ে তার তেমন বাপ। এই দুজন মিলে কবে যেন পাগল করে ফেলবে ওকে!
লাবণ্য এই লাবণ্য তিনবার ডাক লাগাল রিয়াদ।
আসছি, বাবা আসছি, আমার মাত্র দুইটা হাত, দশ বারোটা না যে দশ হাতে সব করে ফেলব। পাগল হয়ে যাব আমি তোমাদের জ্বালায়। গজ গজ করল লাবণ্য।
পাগল না, সোনা পাগলী হবে, আগের মতো। আর হ্যাঁ রুমাল দাও তো। তোমাকে ছাড়া আমার চলে?
হয়েছে হয়েছে আর পাম দিতে হবে না। এই নাও তোমার রুমাল। এখন জলদি এসো নাস্তা করতে। অবনিকে ডাক দাও।
মা, আমি আজ পাউরুটি-জেলি খাব না। মুখ কুঁচকে ভঙ্গি করে বলল অবনি।
মারব এক থাপ্পড়। রেগে উঠল লাবণ্য। ইয়ার্কি মারছ তাই না? অসভ্য মেয়ে হয়েছে একটা আমার। এই দেখ ঘড়িতে সাতটা বেজে গেল, জলদি বের হও।
স্বামী আর মেয়েকে বিদায় দিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল লাবণ্য, সকাল বেলা তাদের তৈরি করে পাঠানোর মতো কষ্টের কাজ যেন আর নেই। ভোর বেলা উঠেছে, তাই বড় করে হাই তুলল লাবণ্য। টেবিল গুছিয়ে ফ্রিজ থেকে মাংস নামিয়ে পানিতে ভিজিয়ে রাখল। বিছানা উঠাতে হবে। বেডরুমের দিকে পা বাড়াল লাবণ্য। লাবণ্যর স্বামী একজন ডাক্তার। মানসিক রোগের ডাক্তার। মেয়ে অবনি ক্লাস টু-তে পড়ে। বয়স মোটে আট। লাবণ্যদের ফ্ল্যাটটা রাজধানীর সেগুন বাগিচায়। দশ বছরের সংসার জীবনে লাবণ্য খুব সুখী, খুব তৃপ্ত। ড্রেসিং টেবিল গোছাতে গোছাতে আয়নার দিকে তাকাল লাবণ্য, হাসল। ধোয়ার সব কাপড় বাথরুমে ভেজানো শেষ করে ঘড়ি দেখল লাবণ্য, এগারোটা বাজে। বুয়া আসে না কেন? ঠিক তখনই ডোর বেলটা বেজে উঠল।
এত দেরি করলে কেন তুমি? প্রশ্ন করল লাবণ্য।
আপা আমার ছোড পোলাটা অসুখে পড়েছে।
আচ্ছা ঠিক আছে, ঠিক আছে। যাও সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধুয়ে নাও।
বুয়াকে কাজ বুঝিয়ে দিয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিল লাবণ্য। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। লাবণ্য জানালা দিয়ে তাকাল বৃষ্টির দিকে, দীর্ঘশ্বাস ফেলে পেপারে চোখ বুলাতে লাগল লাবণ্য। ধারাবাহিক একটা প্রতিবেদন প্রতিদিন পড়ে লাবণ্য, প্রতিবেদনের বিশেষ অংশটা লাবণ্য বারবার পড়ল। নাহ! নাম বর্ণনা কোনো কিছুতেই ভুল নেই। হঠাৎ একবুক কষ্ট ওর বুকটা শূন্য করে দিল। এত বড় মিথ্যা, এত বড় প্রতারণা! পেপার ফেলে লাবণ্য ছুটে ওর শোয়ার ঘরে। ওর ব্যক্তিগত ড্রয়ারটা খুলল। ড্রয়ারের এক কোনায় টেপ দিয়ে আটকানো কাগজটা খুলল। কাগজের ভেতর খুব সুন্দর একটা ছবি। ছবির ছেলেটা খুব ফর্সা, চুলগুলো খুব কালো, সবচেয়ে সুন্দর চোখটা যেন পানি টলটল করছে, পলক ফেললেই পানি গড়িয়ে পড়বে। হঠাৎ কী যেন হল লাবণ্যর। দশ বছর ধরে চেপে রাখা কান্না উঠে এলো ওর ভেতর থেকে। আশ্চর্য এত ভালোবাসা, এত ভালোবাসা! কোন আবেগের পেছনে লুকিয়ে ছিল? মিথ্যা নয় সত্য! এতদিন অরণ্যর কথা ভুলেই ছিল লাবণ্য। মিথ্যা আর ভালোবাসা পাশাপাশি চলতে পারে না। কিন্তু আজ এই ভালোবাসাটাই ওর জীবনে সবচেয়ে বড় সত্য। লাবণ্য আজ সত্যি বলবে নিজেই সে সত্য যার সামনে ও সুখী তৃপ্ত, সু-গৃহিণীর একটা মুখোশ পড়ে ছিল। তবে এটাও সত্য যে, মুখোশ আর মুখ আজ এক হয়ে গেছে। অরণ্যের কথা লাবণ্যের প্রায় মনেই পড়ে না। তা মিথ্যা নয়, কারণ মিথ্যার সঙ্গে ভালোবাসা থাকতে পারে না। অরণ্য আসে নীরবে বৃষ্টিভেজা পৃথিবীতে ওর কানে ফিস ফিস করে বলে লাবণ্য বৃষ্টিতে ভিজবে?
কিন্তু লাবণ্য যে গত দশ বছর ধরে বৃষ্টিতে ভেজে না, কখনও না। কারণ বৃষ্টির হাত ধরেই যে ও হাত ধরে ছিল অরণ্যর, সেই পনের বছর আগে। ক্যালেন্ডারের দিকে তাকাল লাবণ্য, পনের বছর!
এক যুগ তিন বছর। মনে পড়ে গেল পনের বছর আগের স্মৃতি-
প্রথম দেখার, ভালোবাসা এবং চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ!
সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে, জঘন্য বৃষ্টি! ছাতা মাথায় দিয়ে রিকশার জন্য অপেক্ষা করছিল লাবণ্য। ধুর! বিরক্ত হয়ে ঘড়ি দেখল ও, আজ কলেজে ঢুকতেই দেবে না, দরজা থেকেই বিদায়। মনে মনে বৃষ্টির চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগল। হঠাৎ একটা রিকশা পেয়ে গেল।
এই রিকশা, এই, সিদ্ধেশ্বরী কলেজে যাবে?
এই রিকশা মালিবাগ মোড়ে যাবে? সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠল একটা ছেলের কণ্ঠ।
সোজাসুজি, তাকায় লাবণ্য, দেখতে পায় ছাতা হাতে ওই পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে।
হ, যামু। গম্ভীর কণ্ঠে বলে ওঠে রিকশাচালক।
লাবণ্য এগিয়ে যায়, ছাতা বন্ধ করে যেই রিকশায় উঠতে যাবে দেখে ছেলেটাও ছাতা বন্ধ করেছে। আপনি যাবেন কেন? অবাক ও রাগী কণ্ঠে বলে উঠে লাবণ্য।
আমারও সেই একই প্রশ্ন। শক্ত মুখে বলে ছেলেটা।
অর্থ কী? রিকশা ডাকলাম আমি, যেতে চাচ্ছেন আপনি? আশ্চর্য।
হু, খুবই আশ্চর্য। রিকশা ডাকলাম আমি, আর সুন্দর উঠে যাচ্ছেন আপনি। ভালো, ভালো!
মুখ বাঁকাল ছেলেটা।
না! রিকশা আমি ডেকেছি। প্রায় চিৎকার করে প্রতিবাদ করল লাবণ্য।
তাহলে প্রমাণ করুন আমি ডাক দেইনি? আর রিকশাওয়ালা আমার ডাকেই সম্মত হননি?
হ্যাঁ, ভাই আপনি বলুন? চোখে আশা নিয়ে লাবণ্য তাকাল রিকশাওয়ালার দিকে।
রিকশাওয়ালা মাথা চুলকাল, একটু ভাবল তারপর বলল, একলগে ডাক দিছেন, কারে যে হ কইছি মনে নাই, তয় বোকার লাহান না ভিজা, শিয়ারে উইঠা পড়েন। ভাইজানরে আমি মালিবাগ মোড়ে নামায় দিমুনে, এইডা কোনো ঘটনাই না।
অসম্ভব, আঁতকে উঠল লাবণ্য। যার-তার সঙ্গে আমি রিকশায় উঠি না।
আমারও সেই একই কথা। মুখ শক্ত করে বলে ছেলেটা।
আপনাগো যা ইচ্ছা। উদাস গলায় বলে উঠে রিকশাচালক। থাকেন দাঁড়াইয়া আমি যাইগা, আপনেরা কাইজ্জা করেন।
না, না ভাই দাঁড়ান, আঁতকে উঠল লাবণ্য। তারপর ছেলেটার দিকে বিষদৃষ্টি হেনে বলল, একদিন না হয়, যার-তার সঙ্গেই গেলাম।
আমারও সেই একই কথা, শক্ত মুখে বলল ছেলেটা।
রিকশায় উঠে চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করতে লাগল লাবণ্য। ইশ! কেউ দেখে ফেললে কী হবে? দূর! আজই পরীক্ষা হতে হল। বেয়াদব, বেহায়া, নির্লজ্জ ছেলে অন্য রিকশায় গেলে কী হতো? তারপর আড়চোখে তাকাতে ধরা খেয়ে গেল।
গলা খাঁকারি দিল ছেলেটা, আমার নাম অরণ্য, আপনার নামটা কী?
লাবণ্য শক্ত গলায় বলল লাবণ্য, গলার স্বরটা হয়ে গেল ছেলে ছেলে।
এর প্রায় পাঁচ দিন পর কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে রিকশা ডাকছে লাবণ্য। হঠাৎ দেখতে পেল, হ্যাঁ, অরণ্যই তো। ওই দিন রাগারাগি করলেও আজ ওকে দেখে লাবণ্য বেশ মজা পেল। হাত উঁচু করে ডেকেও ফেলেছিল, কিন্তু দেখল অরণ্যই ওর দিকে আসছে।
ভালো আছেন? হাঁপাতে হাঁপাতে বলল ছেলেটা।
কী ব্যাপার আজও বুঝি আমার রিকশায় ভাগ বসাবেন?
কেন? ওই দিন তো আপনিই এ কাজটা করেছিলেন। অবাক কণ্ঠে বলল অরণ্য, মনে নেই?
দেখেন! ঝট করে হাত তুলল লাবণ্য।
আজ ঝগড়া করতে আসিনি, এটা করতে সময়মতো একদিন আসব। আজ এসেছি ঋণ শোধ করতে। হাসি দিয়ে বলল অরণ্য।
কী? অবাক হল লাবণ্য।
হ্যাঁ, নইলে আপনাকে খুঁজতে এদিকে কে আসে? ওই দিন রিকশা ভাড়ার অর্ধেক আমার দেয়ার কথা ছিল। তা কত দিব?
হতভম্ব ভাব কাটিয়ে উঠতে সময় লাগল লাবণ্যর, আপনি আমাকে টাকা দিতে এসেছেন? তারপর হাত বাড়াল, সুদে আসলে পুরো বিশ টাকা।
ক্ষমা করবেন, আমি সুদ দেই না। তবে একটু বেশি ভাড়া দিতে আপত্তি নেই। এই নিন, বলে মানিব্যাগ থেকে বিশ টাকা বের করে বাড়িয়ে ধরল। আচ্ছা আপনার নামটা যেন কী?
লাবণ্য ছোট করে উত্তর দিল লাবণ্য।
স্বভাবের বন্যতা কি নামের কারণেই? নিরীহ প্রশ্ন অরণ্যর।
আর আপনার মনের অরণ্যে কোন কোন জন্তুর বাস? ততোধিক নিরীহ জিজ্ঞাসা লাবণ্যর।
যে জন্তুরই হোক, বন্য জন্তুর তো নয়। বলেই হেসে ফেলল অরণ্য।
আমাকে আবার বন্য জন্তুর সঙ্গে তুলনা করছেন না তো?
কী যে বলেন? এত বড় সাহস কার? বলুন তো?
হয়েছে নাটক বাদ দিন। চলুন সামনে হাঁটি।
এরপর হাসি, দুজনই হাসতে হাসতে গল্প করতে করতে হাঁটতে থাকে। একসময় মালিবাগ মোড়ে এসে দাঁড়িয়ে যায় অরণ্য। হাত তুলে সামনের চারতলা বাসাটা দেখায়। ঐটা আমাদের বাসা, মানে ছোট আপার বাড়ি। ওখানেই থাকি আমি, কোনো দিন কোক খেতে ইচ্ছা হলে চলে আসবেন।
লাবণ্য হাসে, উত্তর দেয় না।
এরপর কলেজে যেতে, আসতে যতবারই মোড় পার হয় কী এক আকর্ষণে লাবণ্য তাকায় বাড়িটার দিকে। নাহ! দেখা পায় না ও অরণ্যের। নিজেকে ধমক মারে, একটা ঝগড়াটে ছেলের জন্য এত উতলা হলে কি চলে? তারপর হঠাৎ আবার দেখা পায় ছয় মাস পর।
নিউমার্কেটে এসে লাবণ্য শুধু ঘুরছে। ধ্যাত! কোনো কিছুই চোখে পড়ছে না যে মায়ের জন্য কিনবে। নিউমার্কেটে এসে তখন থেকে শাড়ির দোকান, শো-পিসের দোকানে শুধু ঘুরেই চলছে। একাই এসেছে তাই আরও রাগ হচ্ছে। হঠাৎ ডাক শুনতে পায়, বন্য এই বন্য।
চরকির মতো পাক খেয়ে ঘুরে তাকায় লাবণ্য। নাহ! কেউ নেই তো। ওকে এভাবে খুঁজতে দেখে দুএকটা দোকানি মুখ টিপে হাসে। রাগ হয় লাবণ্যর। দুপদাপ পা ফেলে সামনের দিকে হাঁটতে থাকে।
এই বন্য! এই! পাশ থেকে কেউ বলে ওঠে আবার। পাশ ফিরতেই দেখে অরণ্য একমুখ হাসি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এসব কী হ্যাঁ? কোমরে হাত দিয়ে লাবণ্য মুখ লাল করে বলে, বন্য বলেছেন কেন?
কী করব? আগের অংশটা মনে নেই। সরল মুখে বলল অরণ্য।
আপনার অভ্যাসটা খুব খারাপ। শুধু শুধু ঝগড়া করেন তাও একদম গায়ে পড়ে। ঝাঁঝের সঙ্গে বলল লাবণ্য।
কই? আমি কত দূরে দাঁড়িয়ে, আমি অসহ্য হতে পারি, অসভ্য নই। তা কি খুঁজছেন?
আমার মাথা। ফোঁস করে উঠল লাবণ্য।
মাথা কেন? মাথা তো আপনার সঙ্গেই আছে। খুঁজতে হয়তো একটু মগজ খুঁজুন যা আপনার স্বাভাবিকের চেয়ে কম আছে। একটু সরে দাঁড়িয়ে বলে অরণ্য।
কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে হেসে ফেলেন লাবণ্য। আমার মায়ের আজ জন্মদিন। একটা মনের মতো গিফট খুঁজছি, কিচ্ছু পাচ্ছি না।
এক কাজ করুন মোবাইল কিনে দিন? বুদ্ধি দিল অরণ্য।
চোখ গরম করে তাকাল লাবণ্য, এতো বাজেট নেই, হাজারের মধ্যে কিছু বলুন।
রান্নাঘরের কিছু কিনে দেন।
নাহ! জোরে বলে ওঠে লাবণ্য, জন্মদিন মায়ের, হতচ্ছাড়া রান্নাঘরের না।
তাহলে, তাহলে হ্যান্ডব্যাগ কিনে দেন। ভয়ে ভয়ে বুদ্ধি দিল অরণ্য।
ঠিক, ঠিক, ঠিক কথা। খুশি হয়ে উঠল লাবণ্য।
ব্যাগ কিনে লাবণ্য জানতে চাইল, তা কী করা হয় জনাবের?
আমার? আমি, অনার্স পরীক্ষা দিয়ে টো টো করে ঘুরছি।
খুব ভালো কথা। এরপর কী করবেন- মাস্টার্স না এমবিএ?
আগে রেজাল্ট হোক তারপর দেখা যাবে। আপনি কী পড়েন? মানে এইচএসসি কোন বর্ষ?
এইচএসসি? ইয়ার্কি মারেন, না? আমি অনার্স পড়ি বুঝলেন, সমাজকল্যাণ তৃতীয় বর্ষ।
তা আমি আগেই জানতাম, দেখতে যেই বুড়ি, বুড়ি লাগে। তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে বলল অরণ্য।
কী? আমি বুড়ি? তুমি মানে আপনি বুড়া দাদা, ব্যাটা ফালতু এখনও পড়া শেষ করে নাই…
আরও কিছু বলার আগে অরণ্য হাতজোড় করল, মাফ চাই, ঝগড়া-বেগম।
হেসে ফেলল লাবণ্য। হাঁটতে হাঁটতে কখন যে নিউমার্কেটের বইয়ের দোকানের সামনে চলে এসেছে ওরা বুঝতেই পারেনি। হাঁটতে হাঁটতেই বার দুয়েক অরণ্যর দিকে তাকাল লাবণ্য। রোদ এসে পড়েছে অরণ্যর মুখে, ওর কেন যেন হাত দিয়ে রোদটা আটকে দিতে ইচ্ছা হল, ইচ্ছা হল ওর হাতটা ধরতে।
বই পড়েন?
কী বললেন? চমকে উঠল লাবণ্য।
বলছি বই পড়া হয়? নাকি পড়লেও তা রূপচর্চা ও রান্নার বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ? হালকা খোঁচা দিয়ে বলল অরণ্য।
থমকে দাঁড়িয়ে গেল লাবণ্য। কোমরে হাত, আপনার সমস্যাটা কী? খালি খোঁচা মেরে মেরে কথা।
লাবণ্যর অনুকরণে অরণ্যও কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়াল, আপনার সমস্যা কী? কথায় কথায় কোমরে হাত?
লাবণ্য গাল ফুলিয়ে অন্যদিকে তাকাল, ওর দিকে আড়চোখে তাকিয়ে অরণ্য বলল, এত রাগ। ওকে পাশ কাটিয়ে অরণ্য আগে চলে গেল বইয়ের দোকানে, দাঁড়িয়ে বই দেখতে লাগল।
অরণ্যর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে লাবণ্যর অদ্ভুত এক অনুভূতি হল, মনে হল ছেলেটির সঙ্গে এই ফাটা রোদে ও ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাস্তায় হেঁটে বেড়ায়। ঝুম বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়…। কিন্তু, কিন্তু অহংকারী ছেলেটা ওর ফোন নাম্বারটা পর্যন্ত জানতে চাইল না। ওর আর অরণ্যর সম্পর্ক যেন কেবল রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া করার।
এই যে, ঝগড়া কইন্যা, এই নিন এটা আপনার জন্য, বলে ওর হাতে তুলে দিল সমরেশ মজুমদারের কালবেলা উপন্যাস। তারপর ভ্রু তুলে হাত বাড়িয়ে বলল, পৃথিবীটা হল, দেয়া আর পাওয়ার জায়গা, কই আমার বই কই?
লাবণ্য হেসে ফেলল, ইশ আমি বুঝি, চেয়েছি? এত বেহায়া মানুষকে আমি দেখি নাই। মুখে বলল বটে কিন্তু এগিয়ে গেল বইয়ের দোকানের দিকে। বন্ধুত্ব করার একটা বুদ্ধি এসেছে ওর মাথায়।
এই নিন। বলে অরণ্যর দিকে সুনীলের মধুময় গল্পের বইটা বাড়িয়ে ধরল লাবণ্য, আমার সবচেয়ে প্রিয় বই আপনাকে দিলাম।
আমাকে নকল করে। টিটকারি মারল অরণ্য, মাধবী লতা হল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা, বইটা পড়লেই বুঝবেন।
বললেই হল? মধুময়ের তুলনা মধুময়। ওর মতো এত ভালোবাসতে পারবে না কেউ। মাধবীলতাও না।
আবার ঝগড়া, হাত তুলল অরণ্য। আচ্ছা মাধবী লতা হল শ্রেষ্ঠ প্রেমিকা। এই ক্যাটাগরিতে শ্রেষ্ঠ প্রেমিক হল মধুময়, খুশি?
খুউব।
চলুন আপনাকে রিকশা…।
মোটেও না, তারপর আবার ঝগড়া লেগে যাবে। সেই দিনের মতো, আমি নিজেই যেতে পারব।
বইয়ের ভেতর বন্ধুত্বের আহ্বান, এক কোণে ফোন নম্বর লিখে দেয়ার পদ্ধতিটা যতই পুরনো হোক না কেন লাবণ্য ও অরণ্য এই পদ্ধতিটাই সেদিন বেছে নিয়েছিল।
এরপর দুইটা মাস কেটে গিয়েছিল বন্ধুত্বের গভীরতায়। কথায় মেঘমালা তৈরি করে তাতে আবার কথার বৃষ্টি নামিয়েছে দুজনে টেলিফোনে। বৃষ্টি হলে, চাঁদ উঠলে সব সময় অরণ্য সরব হয়ে উঠত। লাবণ্যর খুব অদ্ভুত লাগে কীভাবে অচেনা দুজন এত কাছের হয়ে উঠল।
লাবণ্য আর অরণ্য দুজনই জানত ওরা একে অপরের কাছে বাধা। সে দিনটার কথা মনে হল লাবণ্যর যেদিন অরণ্য বলেছিল ভালোবাসার কথা।
লাবণ্য, চল আজ সারাটা দিন আমরা শুধু ঘুরব।
কেন? আমি কি তোমার মতো টো টো কোম্পানি?
এত কথা বল কেন? অধৈর্য ভঙ্গিতে হাত নাড়ল অরণ্য।
কারণ আমি যে, বাচাল। হাসল লাবণ্য।
বকবক থামিয়ে ঠিক কর, যাবে নাকি? রেগে যাচ্ছে অরণ্য।
যাব না আবার! উঠে দাঁড়ায় লাবণ্য, তোমার সঙ্গে একটা জায়গা ছাড়া সবখানে যাব আমি।
সব জায়গায় তোমাকে নিয়ে যাব আমি, বুঝলা!
হুম খুব ভয়ের কথা, আচ্ছা চল যাই।
লাবণ্যকে নিয়ে বিভিন্ন শাড়ির দোকানে ঘুরতে থাকে অরণ্য। লাবণ্য বিরক্ত হয়, শাড়ি কিনছ কেন?
আমার ইচ্ছা শাড়ি কেটে লুঙ্গি, ফতুয়া ইত্যাদি বানাব।
ঢং করে বেইলি রোডের রাস্তায় বসে পড়ে লাবণ্য, দুহাত নেড়ে বলে, আমাকে মাফ কর বাপ, আর পারি না। তারপর একটু ভেবে আবার বলে উঠল, চল-চল আড়ং যাই, ওদের কালেকশন খুব ভালো, তোমার পছন্দ হবে। কিন্তু বাজেট কত?
বাজেট নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। সুন্দর দেখে একটা পছন্দ করে দেবে। ব্যাস।
আড়ং থেকে খুব সুন্দর একটা শাড়ি কিনল অরণ্য। বের হয়ে গজ গজ করতে লাগল, গলাটা একদম কেটে দিল, সব তোমার জন্য।
আমি কী জানি? আগেই বলেছিলাম। গলা চড়ায় লাবণ্য।
বাদ দাও হাত ওঠায় অরণ্য, চল তোমাকে আজ লাঞ্চ করাই, যত যাই হোক এই লোভেই তো এতক্ষণ ধরে আছ।
দেখ, খিদায় জান যাচ্ছে, তাই আজ তোমাকে ছেড়ে দিচ্ছি নইলে, হাত উঁচিয়ে নখ দেখায় লাবণ্য।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে খবরের কাগজ সবে হাতে নিয়েছে লাবণ্য, ডোর বেলটা বেজে উঠল। দরজা খুলে লাবণ্য দেখে ওর জন্য ইয়া বড় এক কুরিয়ারের প্যাকেট। এত বড় প্যাকেট দেখে অবাক হয় লাবণ্য। নাহ কোথাও কোনো ঠিকানা দেয়া নেই। প্যাকেটটা নিয়ে সাবধানে ওর ঘরে চলে যায় লাবণ্য। মা দেখলে হাজারটা প্রশ্ন করবে। ভাগ্যিস ও দরজাটা খুলেছিল। প্যাকেটটা খুলে ও প্রথমেই দেখে প্যাকেটের সমান একটা কার্ড। কার্ডটা খুব সুন্দর। একটা ছেলে ও মেয়ে দোলনাতে ছাতা মাথায় দিয়ে বসে আছে, আর বৃষ্টি দেখছে। নিচটা পানিতে থৈ থৈ, তাতে বসে আছে ছোট ছোট ব্যাঙ, ব্যাঙের হাতে আবার লাল রঙের হার্ট।
কার্ডের ভিতরে সুন্দর করে লেখা,
ভালোবাসার বৃষ্টি, অথবা বৃষ্টিতে ভালোবাসা
লাবণ্য তুমি আমার হবে?
প্রচণ্ড বৃষ্টিতে নদীতে পা-ডুবিয়ে ছাতা মাথায়
দিয়ে বসে থাকবে? আমি জানি তুমি
আসবে কারণ তুমিও আমাকে ভালোবাস।
কাল চলে এসো, সকাল আটটায় ধানমণ্ডি লেকে
-তোমার অরণ্য।
প্যাকেটের ভেতর থেকে বের হয় ওই শাড়িটা। লাবণ্য অবাক হয় না। ও যেন জানতই অরণ্য ওর। লাবণ্য বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায় আকাশে নানা রঙের মেলা। ঠিকই তো বৃষ্টিতে ভালোবাসা। অকারণেই ওর কান্না পায়। এই ভালোলাগার প্রতিটি মুহূর্ত ও উপভোগ করে চোখের জলে, মুখের হাসিতে।
সকাল আটটায় শাড়িটা পরে বের হয় লাবণ্য। মাকে বলছে তিন্নিদের বাসায় যাচ্ছে।
এই রিকশা যাবে? ধানমণ্ডি?
এই রিকশা যাবে? ধানমণ্ডি? সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠে একটা ছেলে কণ্ঠ।
লাবণ্য সোজাসুজি তাকায় ওর চোখে মুখে খুশি ঝলকে ওঠে অরণ্যর।
কী? ভ্রু নাচায় অরণ্য, দিবেন নাকি আপনার রিকশায় আমায় লিফট?
একদম না। ঝামটা মারে লাবণ্য।
সকালটা খুব সুন্দর, আকাশে কেমন মেঘ করেছে। ঠাণ্ডা, ঠাণ্ডা আবহাওয়া। রিকশা যখন ঢাকা ইউনিভার্সিটি এলাকা দিয়ে যাচ্ছিল তখন অরণ্য গান শুরু করে। আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি তবু মনে হয় এ যেন কিছু নয় কেন আরও ভালোবেসে পারে না… প্রচণ্ড বেসুরে তবুও লাবণ্য কিছু বলে না। ওর খুব ভালো লাগে মনে হয় এই মানুষটা পৃথিবীতে এসেছে শুধু ওর জন্য, লাবণ্য ডাক দেয় অরণ্য।
হু বল। এখনও বেঁচে আছ? ভেবেছিলাম এমন গান শুনে তুমি মরেই গেছ বুঝি।
মরে গেলে খুশি হতে? জিজ্ঞাসা লাবণ্যর ।
হ্যাঁ, তাই তো গান শুরু করেছিলাম। আর আমি যদি মরে যাই?
লাবণ্য হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়, আমি তোমার সঙ্গে আর থাকব না। এটা কোনো প্রশ্ন হল? ওর কণ্ঠে কান্না ধরা পড়ে।
অরণ্য হঠাৎ ওর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে, … জান।
কী বললে?
বলেছি আমার হৃদয়ের রানী, আমার ময়না, টুনটুনি।
থাম থাম, আগে ঠিক করে বল, আমি পাখি না মানুষ।
তুমি আমার, তুমি আমার বউ। আমার বালিকা বধূ।
আমি বালিকা? জোরে হেসে ওঠে লাবণ্য।
অরণ্যর সঙ্গে সম্পর্ক হওয়ার পরের বছরটা ছিল অদ্ভুত সুন্দর। ছোট ছোট ঘটনাগুলো স্মৃতির পাতা থেকে জীবন্ত হতে শুরু করল। লাবণ্যর বুকটা খালি হতে লাগল। মনে পড়ল একটা ঘটনা।
সকাল থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি। কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে অরণ্যর অপেক্ষা করছে লাবণ্য। ইশ, আসে না কেন? যে কোনো সময় ঝুপ করে বৃষ্টি নেমে যাবে। হঠাৎ দেখে অরণ্য আসছে।
এটা আসার কোনো সময় হল? রেগে ওঠে লাবণ্য।
এই কি সমস্যা? এই মেয়েটা তো সব সময় অগ্নিকন্যা হয়ে বসে থাকে। আরে বৃষ্টি দেখে ভাবলাম আরও জোরে নামুক, দুজনে ইচ্ছামতো ভিজি।
ইচ্ছামতো ভিজি। ভেংচি কাটল লাবণ্য। সঙ্গে সঙ্গেই শুরু হল বৃষ্টি।
খুব ভালো হয়েছে, খুশির আমেজ ধরা পড়ল অরণ্যর কণ্ঠে। এই যে অগ্নিকন্যা, আসুন আমরা আজ বৃষ্টি স্নান করি, অনেক ভিজি বৃষ্টির শুদ্ধ জলে।
লাবণ্য খিল খিল শব্দে হেসে উঠল। আচ্ছা চলুন, লাবণ্য বলল, রাজকুমার, আজ আমরা ভিজি।
ঘণ্টা হিসেবে রিকশায় ঘুরতে ঘুরতে লাবণ্য গুনগুন করে গান ধরল। আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব, আমি তোমার সঙ্গে। বৃষ্টির পানি হাত দিয়ে স্পর্শ করতে করতে ওর মনে হল এই তো জীবন। এই জীবনে আর বেশি চাওয়া নেই লাবণ্যর। তুমুল বৃষ্টিতে দুজনেই ভিজতে লাগল, এর মাঝে অরণ্য আইসক্রিম কিনে আনল, বৃষ্টিতে কাঁপতে কাঁপতে দুজনেই আইসক্রিম খেতে লাগল।
অরণ্য বেকার। মাস্টার্স ভর্তি হলেও ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অরণ্যর দুলাভাই ভালো না। ওর বোনকে খুব অত্যাচার করে। অরণ্যর এসব দুশ্চিন্তার কথাও লাবণ্যর অজানা থাকে না। ও অরণ্যর দিকে তাকায়, কী সুন্দর দুচোখ, তুমি এমন চিন্তাকুমার হয়ে গেলে, কেন হঠাৎ?
দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরণ্য, লাবণ্য তুমি কি পারবে আমার জন্য অপেক্ষা করতে? কেমন অসহায় শোনায় অরণ্যর কণ্ঠ।
অনন্তকাল করব। কারণ তুমি ছাড়া আমার কোনো গতি নেই। ব্যাপারটা এমন, তুমি আমার একটা অংশ হয়ে গেছ। এমন অংশ যা কেটেও বাদ দেয়া সম্ভব না। তুমি চিন্তা কর কেন? পার্ট টাইম চাকরি তো করছ। আমিও তো কোনো রাজকন্যা নই। ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র কন্যা। দরকার হলে ব্যবসা করব।
এরই মাঝে একদিন হঠাৎ লাবণ্যর মাথায় বুদ্ধি আসে। জরুরি তলব করে অরণ্যকে ডেকে আনে। চল অরণ্য চল।
কোথায়?
আরে চল না।
লাবণ্য অরণ্যকে সঙ্গে নিয়ে ওর বান্ধবী তিন্নিদের বাসায় যায়। তিন্নিরা, যাকে বলে কোটিপতি। ওদের বাড়িটা খুব সুন্দর ধানমণ্ডি লেকের একদম সঙ্গে। তিন্নিদের বাসায় কেউ থাকে না বলতে গেলে, ওর বাবা-মা সর্বক্ষণ বাইরে। লাবণ্য অরণ্যকে সঙ্গে নিয়ে তিন্নিদের ছাদে যায়। তিন্নিদের দোলনাতে বসে দুজনে সূর্যাস্ত দেখে, সূর্যের স্তিমিত আলো অরণ্যর চোখে মুখে পড়ে, অরণ্যকে এত সুন্দর লাগে যে, লাবণ্য ওর গাল টিপে দেয়।
এটা কী হল? অবাক কণ্ঠে জানতে চায় অরণ্য।
গাল টিপে দিলাম। দুষ্টু হাসে লাবণ্য।
আমিও দেই? বলেই অরণ্য লাবণ্যর গাল টিপে দিল। ফিস ফিস করে বলল। তোমাকে ঠিক হলদে পরী লাগছে। একদিন আসবে যখন আমরা একসঙ্গে সূর্য সর্বদাই দেখব। তারপর সুর করে গান ওঠে,
কাটবে প্রহর তোমার সাথে
তোমার সাথে
হাতের পরশ রইবে হাতে…
অরণ্যর সঙ্গে গলা মিলাল লাবণ্য এই জীবনে যে কয়টি দিন পাব তোমায় আমি ভালোবেসে…
সময়টা ছিল খুব সুন্দর, পাখিরা কিচির-মিচির করতে করতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছে। আকাশটা ক্ষণে ক্ষণে রঙ বদলাচ্ছে। কখনও বাসন্তী, নীলের মিশেল, কখনও বা লাল-বাসন্তী আর ছাই বর্ণ। আস্তে আস্তে চাঁদ মামা উঁকি দিল, আকাশটা কালচে হতে লাগল। অপূর্ব এই দৃশ্য উপভোগ করতে করতে লাবণ্য আর অরণ্য যেন হারিয়ে গেল স্বপ্নের জগতে। মৃদু মিষ্টি বাতাস চুল উড়িয়ে দিল লাবণ্যর, স্পর্শ করল অরণ্যর গাল।
লাবণ্য আর অরণ্যর ভালোবাসার কথা, ওদের ভালোবাসার এক বছরের মাথায় জানাজানি হয়ে যায়, লাবণ্যর বড় মামা ওদের একসঙ্গে মার্কেটে দেখে ফেলে। তারপর বাসার সবাই লাবণ্যর ওপর টর্নেডো ঝড় বইয়ে দেয়।
পছন্দ করেছিস, এমন ছেলেকে? ওর মা ভ্রু কুঁচকে জানতে চায়। ছেলে কিছু করে, থাকে ছোট বোনের বাড়ি। এ কোন ছেলে হল?
লাবণ্য কিছু বলে না, ওর কষ্টে মরে যেতে ইচ্ছা করে। ও চুপ করে থাকে, তিন চার মাস ওর ওপর মানসিক অত্যাচার চলে, কখনও ধমকে, কখনও কেঁদে, কখনও আদর করে ওকে বোঝায়। কিন্তু লাবণ্য বোঝে না। লাবণ্য বাবা-মার একমাত্র সন্তান তার ওপর ও একটু অসুস্থ। লাগাতার টেনশন করতে করতে একদিন হঠাৎ জ্ঞান হারায়। ডাক্তার বলে ওর ওপর কোনো চাপ না দিতে। কারণ মানসিক অবসাদে লাবণ্য কিছু করে বসতে পারে। এরপর ওদের বাসার পরিবেশ বদলে যেতে থাকে। ওকে কেউ কিছু বলে না।
বাবা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, কী আর করা, দরকার হলে ছেলেকে আমাদের সঙ্গে রেখে দেব।
মা-ও সুর মেলায়, হু খারাপ হবে না, একমাত্র মেয়ে আমাদের। ছেলের শুনেছি বাবা-মা নেই। আহা বেচারা, আমাদের ছেলের মতোই তো।
লাবণ্যর মুখে এই কথা শুনে অরণ্য লাফ দিয়ে ওঠে, কী? আমি হব ঘর জামাই? আমি কি এতটাই অপদার্থ?
লাবণ্য হাসে, না, না তুমি হলে আমার অরণ্য অপদার্থ হবে কেন? না হয় থাকলে আমাদের বাসায় কী হল তাতে! রাজকন্যা নেবে আর রাজপ্রাসাদে থাকবে না তা কী হয়?
সে দেখা যাবে, রাজি হয়েছে তাতেই আমি মহা খুশি। স্বস্তির হাসি হাসল অরণ্য।
তারপর, অরণ্য যেদিন চাকরি পায় সেদিনটা ছিল রৌদ্রে ভরা। লাবণ্য ঘুমিয়ে ছিল।
অরণ্য ফোন দেয়, হ্যালো লাবণ্য, চাকরি হয়ে গেছে, জান।
কী? জোরে চিৎকার করে ওঠে লাবণ্য, ঘুম থেকে উঠে বসে হুড়রে! বেতন কত?
ছিঃ এত বড় হয়েছ জানো না ছেলেদের বেতন আর মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে হয় না।
বলেছে তোমাকে! তুমি তো তুমি, আমার তুমি তোমার কাছে জানতে চাইব না?
আপাতত পনের হাজার, দুই বছর পর আরও বাড়বে।
তার মানে আরও দুই বছর পর বিয়ে করব? অভিমানী কণ্ঠে জানতে চায় লাবণ্য।
না, না আজই করব। আমি তোমার জন্য মার্কেট থেকে শাড়ি কিনছি।
….বন্ধ কর, বিয়ে না হয় পরেই করলাম। কিন্তু দেখা এখনই করতে হবে।
এখনি?
হুঃ।
একটু দেরি করা চলবে না?
একদম না।
তাহলে জানালা দিয়ে তাকাও।
কথাটা শুনে লাবণ্য লাফিয়ে জানালার পাশে যায়। ওমা ওই তো অরণ্য, অফিসিয়াল শার্টে কী সুন্দর লাগছে! লাবণ্য দুহাত মাথায় দিয়ে জিব বের করে ভেংচি কাটে। তারপর ইশারা করে বলে চলে যাও। বিকেলে দেখা হবে।
এরপর আরও তিন মাস, অদ্ভুত দিনগুলো হাত গলে চলে যেতে থাকে। তারপর সেই দিন আসে, যেই দিনটা গত দশ বছর ধরে দুঃস্বপ্নের রাত্রে ওকে জাগিয়ে রাখত, সেই দিন যেদিন ও সব হারায়। চোখ বেয়ে আরও কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে।
ভোর পাঁচটার দিকে বিকট শব্দে লাবণ্যদের ফোন বেজে ওঠে। অশুভ আশংকায় লাবণ্য ধরমর করে উঠে বসে, ফোনটা ধরে কোনো মতে বলে, হ্যালো কে বলছেন?
লাবণ্য। ভাঙা ভাঙা কান্না ভরা কণ্ঠ ভয়ংকর ফিস ফিস করে বলে ওঠে, লাবণ্য, অরণ্য… কণ্ঠটা কথা শেষ করে না, ফুঁপিয়ে ওঠে।
ছোট আপি, কী হয়েছে? ভয়ার্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করে লাবণ্য।
অরণ্য, অরণ্যকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে… ফোঁপাতে ফোঁপাতে কণ্ঠটা চুপ হয়ে যায়।
কেন? বুকের ভেতর শূন্যতা অনুভব করে লাবণ্য।
খুন! ছোট করে উত্তর দেয় কণ্ঠটা।
চারপাশের অন্ধকার অক্টোপাশের মতো জাপটে ধরে লাবণ্যকে, ও কথা হারায়, ওখানেই জ্ঞান হারায়।
তারপর… জেল হাজতে দেখা লাবণ্য ও অরণ্যর। অরণ্যর চোখে-মুখে রাজ্যর হতাশা, চোখের নিচে কালি, চোখ তুলে লাবণ্যর দিকে তাকাতে পর্যন্ত পারল না। কোনো মতে প্রশ্ন- ছোট আপি কেমন আছে?
লাবণ্য চোখভর্তি পানি নিয়ে তাকায় অরণ্যর দিকে, নাক টেনে বলে, তুমি কেমন আছ?
ভালো নেই, ভালো থাকি কীভাবে? আপু কেমন আছে?
ভালো না, আমরা কেউ ভালো নেই, কেউ ভালো নেই… ফুঁপিয়ে ওঠে লাবণ্য।
আমি দুঃখিত লাবণ্য… কথা শেষ করতে পারে না অরণ্য।
তুমি কেন দুঃখিত হবে? রাগী কণ্ঠে প্রশ্ন করে লাবণ্য। তুমি তো কোনো ভুল করনি। তোমার লম্পট দুলাভাই তোমার চোখের সামনে তার কাজের মেয়েকে … আর তুমি চুপ থাকবে? কাঁপা কাঁপা গলায় বলে লাবণ্য।
অরণ্য হাসে অদ্ভুত হাসি। তুমি পারবে না লাবণ্য, ওরা অনেক শক্তিশালী তুমি পারবে না। মনে মনে বলে অরণ্য।
আমি পারব, পারতে আমাকে হবেই। মনে মনে নিজেকে বলে লাবণ্য।
ওই দিন অরণ্যকে বড় বড় কথা বললেও রাস্তায় নেমে নিজে ভেঙে পড়ে লাবণ্য। মনে পড়ে কেন অরণ্য হত্যা করল ওর দুলাভাইকে। ঘটনার দিন রাত্রে অরণ্যর বাসায় আসার কথা ছিল না। এ সুযোগটাই নেয় ওর দুলাভাই। রাত্র ১২টার দিকে রান্না ঘরে গিয়ে জাপটে ধরে ওদের বাসার চৌদ্দ বছরের কাজের মেয়ে ময়নাকে। ভয়ে চিৎকার করে ওঠে ময়না। দুলাভাই মেয়েটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। ধস্তাধস্তি আর চিৎকার কানে যায় অরণ্যর বোনের। উনি দৌড়ে রান্নাঘরে এসে নিজের স্বামীকে সরানোর চেষ্টা করে, কিন্তু পেরে উঠে না। ঠিক সে সময় লকের ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঘরে প্রবেশ করে অরণ্য। অরণ্যর বোন দুলাভাইকে সরাতে চেষ্টা করলে দুলাভাই তার চুলের মুঠি ধরে বেদম পেটাতে থাকে, একপর্যায়ে ডাল ঘুটনি দিয়ে নাকে মুখে ক্রমাগত আঘাত করতে থাকে। শব্দ শুনে রান্নাঘরে এসে পাথর হয়ে যায় অরণ্য। ময়নার ফাটা ঠোঁট ছেড়া জামা আর বোনের ক্ষত দেখে আঁচ করতে পারে অরণ্য। দুলাভাই, চিৎকার করে ওঠে অরণ্য, আপাকে ছাড়ুন।
কেন? ছাড়ুম কেন? আমার বউ আমি যা খুশি তাই করুম। হিংস কণ্ঠে চিৎকার করে ওর দুলাভাই।
না, আপনি তা করতে পারেন না। ছাড়ুন আপাকে, নইলে…
অশ্লীল একটা ভঙ্গি করে লুঙ্গি উঁচিয়ে দুলাভাই ওর দিকে তাকায়, কী করবি তুই? ওই খান… পুত করবিটা কী তুই? থু করে থুথু ফেলেন তিনি মেঝেতে, শালা পরগাছার আমারে ডর দেহায়। থাকে খায় আমার ওপর।
দুলাভাইয়ের হাতের ভিতর মোচর খায় আপার শরীর, অরণ্য ভাই ভাই যা, … তুই যা ভাই এখান থেকে।
অরণ্য কিছু বোঝে না কী করবে ভয়ংকর একটা ক্রোধ ওর গলার কাছে উঠে আসে। দুলাভাই ঠিক সেই মুহূর্তে ডাল ঘুটনি দিয়ে আপার মাথায় প্রচণ্ড আঘাত করে। মাগো বলে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আপা। অরণ্যর ক্রোধটা ওর মাথায় এক ভয়ংকর বিস্ফোরণ ঘটায়, পাগলের মতো ছুটে আসে অরণ্য। চোখ পড়ে পড়ে থাকা বঁটির ওপর। আর তারপরেই বারবার কয়েকবার এলোপাতাড়ি বঁটি চালায় ও দুলাভাইয়ের ওপর।
রক্তাক্ত অরণ্য একসময় শান্ত হয়ে যায়, কেঁদে ওঠে চিৎকার করে।
লাবণ্য বাসায় গিয়ে অনেক কাঁদে। ওর বাবা-মা ওকে অনেক বুঝায়।
কিন্তু মাস ছয়েক কোর্টে দৌড়াদৌড়ি করে লাবণ্য কল্পনা আর বাস্তবতার মাঝের পার্থক্য বুঝতে পারে। লাবণ্য ওর সব গয়না বিক্রি করে দেয়। অরণ্যের বন্ধু-বান্ধব আর আত্মীয়দের দেয়া টাকা এক করে ভালো উকিল ঠিক করে। কিন্তু আদালতে এত ডেট পড়ে যে লাবণ্যরা উকিলের টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেয়ে যায়। আদালতে এমনকি ময়নার বাবাও উল্টাপাল্টা সাক্ষী দেয়।
এ পরাজয় লাবণ্য মেনে নিতে পারে না। হতাশায় আচ্ছন্ন হয় ও, হতাশার হাত ধরেই পা বাড়ায় নেশার দুনিয়ায়। বান্ধবী তিন্নি আগে থেকেই এ জগতের বাসিন্দা তাই নেশার উপকরণ জোগাড় করতে বেগ পেতে হয় না লাবণ্যর। হতাশা, অসত্য আর নেশা চেপে ধরে লাবণ্যকে, ভেতরে ভেতরে বিধ্বস্ত হতে থাকে লাবণ্য। তারপর রায় ঘোষণার দিন আসে। লাবণ্য বেঞ্চে বসে কাঁপতে থাকে, ওর তখন একশ দুই জ্বর। সব সাক্ষী-প্রমাণ শোনার পরে বিচারক অরণ্যের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করেন। লাবণ্য তাকায় অরণ্যের দিকে। আশ্চর্য ওর মুখে হৃদয় পাগল করা সেই হাসি। লাবণ্য তাকিয়েই থাকে, দুচোখ দিয়ে ওর পানি গড়াতে থাকে তারপর লাবণ্য জ্ঞান হারায়।
এরপর লাবণ্যের কিছুই মনে নেই। ওর নাকি এরপর টানা তিন দিন বেদম জ্বর থাকে। জ্বর ঠিক হওয়ার পর নাকি ও কেমন অস্বাভাবিক হয়ে যায়। কথা বলে না, প্রশ্নের উত্তর দেয় না, শুধু কান্না করে। ডাক্তার ওর রক্ত পরীক্ষা করে ড্রাগের আলামত পায়। ডাক্তারের পরামর্শে ওকে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানকার ডাক্তার রিয়াদই ওর স্বামী। দীর্ঘ তিন মাস পর ও সুস্থ হয়ে ওঠে। কিন্তু সুস্থ হওয়ার পর ও একবারও অরণ্যের কথা জানতে চায় না, ডাক্তারের পরামর্শে মা-বাবা ওকে সিলেট ওর মামা বাড়ি নিয়ে যায়। মানসিক অসুস্থতা ওর পেছন ছাড়ে না। লাবণ্য স্বপ্নে, জাগরণে সব সময় শুধু অরণ্যের সঙ্গে ফিসফিস করে কথা বলে। প্রায় এক মাস পর হঠাৎ একদিন ও অরণ্যর কথা জানতে চায়। কেউ কোনো উত্তর দেয় না, সময় তখন ভোর পাঁচটা, ঘুম ভেঙে লাবণ্য চিৎকার করে ওঠে। চিৎকার করে জানতে চায় অরণ্যের কথা। উত্তর না পেয়ে লাবণ্য বের হয়ে যায় রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে মামাদের বাড়ির পেছনের ছোট টিলার মতো পাহাড়ের ওপর বসে পড়ে। চোখ পড়ে যায় পূর্বদিকে, হ্যাঁ এখনই তো সূর্য উদয় হবে! না! না! লাবণ্য এ দৃশ্য দেখবে না। লাবণ্য চোখ বন্ধ করে শক্ত হয়ে বসে থাকে। … করে ওর পাশে এসে কেউ বসে লাবণ্য টের পায় ওর বুকটা কেঁপে ওঠে অরণ্য! ও তাকায় তারপর ছিটকে সরে আসে, অচেনা একটা ছেলে।
ছেলেটার হাতে বাদামের প্যাকেট, বাড়িয়ে ধরে বলে- বাদাম খাবেন?
লাবণ্য উত্তর দেয় না, অন্যদিকে তাকায়। আমার নাম রিয়াদ মা-বাবা আদর করে বলে রোদ আপনি কি আমার মতোই সূর্যোদয় দেখতে এসেছেন?
লাবণ্য উত্তর দেয়, না। বিরক্ত হয়, এক ঝলক মিষ্টি বাতাস এসে ওর চুল সরিয়ে দেয়।
উত্তর দিচ্ছেন না কেন? হঠাৎ ছেলেটা হাত বাড়িয়ে ওর চুল সরিয়ে দেয়।
লাবণ্য উঠে দাঁড়ায়, আপনি আমার চুলে হাত দিলেন কেন? রাগে মুখ লাল হয়ে যায় ওর।
এই যে এতক্ষণ পাশে বসে ছিলাম এই অধিকারে, উত্তর দেয় ছেলেটা। তারপর উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে ওঠে- দেখুন দেখুন সূর্যোদয়।
লাবণ্য দেখে না, ওর হঠাৎ কান্না পায় ও বসে পড়ে দুহাতে মুখ ঢেকে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে। ওর পাশে রিয়াদ বসে পড়ে, আশ্চর্য ছেলেটার চোখেও জল। লাবণ্য চোখ মুছে আবার উঠে দাঁড়ায়; হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে বড় একটা গাছের নিচে বসে পড়ে। তারপর ও কল্পনা করে বিয়ের পর ও আর অরণ্য মামার বাড়ি এসেছে। সকাল বেলায় ওরা সূর্যোদয় দেখতে বের হয়েছে, ঠিক এই জায়গায় আমার পর অরণ্যর মাথায় দিল কাক … করে। চিন্তা করে লাবণ্য হেসে ওঠে।
আপনি তো বেশ অদ্ভুত, একটু আগে কাঁদছিলেন এখন হাসি? লাবণ্যের স্বপ্ন ভেঙে যায় ও চোখ তুলে তাকায় ওই ছেলেটা রিয়াদ! ও কী চায়? আপনার কী চাই? জানতে চায় লাবণ্য।
আপনার হাসি, উত্তর দেয় রিয়াদ।
লাবণ্য এই কথায় খুব মজা পায়, উঠে দাঁড়ায়, কেন?
কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি। ছেলেটার কথায় লাবণ্য অবাক হয়ে যায়, ভাবে দেয় এক থাপ্পড়। কিন্তু কিছু বলে না, হাঁটা ধরে আবার, বুঝতে পারে ছেলেটা পেছনে পেছনে আসছে।
ওর পথ রোধ করে দাঁড়ায় ছেলেটা, জানতে চাইবেন না কবে থেকে ভালোবাসি? যেদিন প্রথম আপনাকে হাসপাতালে আনা হয়। আপনার তখন জ্ঞান ছিল না, জ্ঞান আসার পর আপনার স্মৃতি গোলমাল হয় আপনি কিছু বলতেন না, বুঝতেন না, কাউকে চিনতেন না।
লাবণ্য হাত তুলে থামায় রিয়াদকে, আপনি এতসব জানেন কীভাবে?
ছেলেটা হাসে, কারণ আমি আপনার ডাক্তার, যেহেতু আপনি অসুস্থ ছিলেন তাই এখন আমাকেও চিনতে পারছেন না।
আচ্ছা মানলাম আমি পাগল ছিলাম, কাউকে চিনতাম না তো কী হয়েছে? আপনি যখন আমার ডাক্তার তাহলে তো আপনার জানা উচিত কী কারণে আমি পাগল হয়েছিলাম। একটু দম নেয় লাবণ্য তারপরও প্রেমে পড়ে গেলেন?
হ্যাঁ, ঠিক তাই, আমি প্রেমে পড়লাম সেই মেয়ের যে মেয়ে ভালোবাসতে জানে। আপনি যখন প্রচণ্ড ভয়ে কাঁদতেন তখন আপনাকে পাপহীন বাচ্চার মতো লাগত।
তখনকার কথা আলাদা ধৈর্যহারা কণ্ঠে বলে লাবণ্য, আজ আমার আশ্রয়ের প্রয়োজন নেই আমার আশ্রয় আমার অরণ্য, আমার পৃথিবী আমার অরণ্য।
আমি কবে না বললাম? হাসে রিয়াদ। আপনার পৃথিবী আপনার, আমার ভালোবাসা আমার। জীবনটা কী অদ্ভুত! আপনাকে যেদিন প্রথম হাসপাতালে আনা হয় আপনাকে দেখে আমার মনে সৃষ্টি হয় প্রচণ্ড মায়া। এত ভালোবাসা নিয়ে এ মেয়ে বেঁচে আছে কীভাবে? কেউ কাউকে এত ভালোবাসতে পারে! তারপর দিনে দিনে আপনাকে কীভাবে যেন ভালোবেসে ফেললাম, আপনি হয়ে উঠলেন আমার অংশ।
কক্ষনও না। চিৎকার করে উঠে লাবণ্য, আমি অরণ্যর, শুধু ওর। হোক না ও খুনি, হোক না ওর ফাঁসি। ভেবেছেন অরণ্য নেই তাই এত সহজে আমাকে পেয়ে যাবেন।
না, তো, তা ভাবব কেন? প্রশ্ন করে রিয়াদ, লাবণ্য বৃষ্টি হলে গুটিয়ে যাওয়া, সূর্যাস্ত, সূর্যোদয় দেখে মুখ ফেরানো, হাসতে গিয়ে কেঁদে ফেলা এভাবে আপনি যা করছেন তা হল জীবন থেকে পালিয়ে বাঁচা। আমি শুধু চাই আপনি ভালোভাবে জীবনটাকে উপভোগ করুন জীবন কিন্তু একটাই। লাবণ্য উত্তর দেয় না, ও কিছু জানতে-বলতে চায় না ও দ্রুত মামার বাসায় চলে যায়।
অরণ্যের কথা জানতে চাইলে সবাই গুটিয়ে যায়। লাবণ্যের কিছুই ভালো লাগে না। রাত-দিন ঘুমহীন চোখে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। এই আকাশের নিচে ওরা দুজন আছে। একই চাঁদ, সূর্য ওদের প্রতিদিন দেখে। সকালবেলার প্রথম আলো তো একই সঙ্গে ওদের দুজনকে স্পর্শ করে। একদিন ছাদে বসে বসে লাবণ্য আকাশ দেখছে হঠাৎ… বৃষ্টি শুরু হয়, লাবণ্য উঠে না, বসে বসে স্বপ্ন দেখে। একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে ভিজে কাঁপতে কাঁপতে লাবণ্য রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকে, খুব সুন্দর রাস্তা চারদিকে গাছ আর গাছ। কৃষ্ণচূড়া গাছে আগুন রঙের ফুল ফুটেছে, হঠাৎ… লাবণ্য দেখে এই তো অরণ্য ওর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে, লাবণ্য দৌড় দেয় কিন্তু ও পড়ে যায়। শব্দ শুনে অরণ্য পেছনে ফিরে তাকায় তারপর দৌড়ে আসতে গিয়ে ও পড়ে যায়। লাবণ্য হেসে ওঠে, অরণ্যও হেসে ওঠে। তারপর দুজনে হাতে হাত রেখে হাঁটতে থাকে।
আপনি বৃষ্টিতে এভাবে ভিজছেন কেন? কানের কাছে শব্দ করে বলে ওঠে রিয়াদ।
লাবণ্য চোখ খুলে তাকায়, ওর প্রচণ্ড রাগ হয়, এই বেয়াদব ছেলেটা ওকে শান্তিতে স্বপ্ন দেখতে দেয় না- আমার ইচ্ছা তাই, আমার ইচ্ছা তাই। শান্ত গলায় বলে লাবণ্য।
তাই নাকি! বিদ্রুপ ঝরে পড়ে রিয়াদের কণ্ঠে। আপনার ইচ্ছাতেই বুঝি সব হয়?
আমি তা বলিনি শুধু বলেছি আমার জীবনে আমি যা ইচ্ছা তাই করব।
আপনার জীবন! বাহ! দারুণ তো, এই জীবনটার ওপর অধিকার যদি শুধু আপনার হয় তাহলে আপনার বাবা-মা কেন এত কষ্ট করছে। আপনার মন রক্ষার্থে সর্বস্ব দিয়ে তারা অরণ্যের জন্য যুদ্ধ করেছেন? আপনাকে নিয়ে পাগলের মতো দৌড়াদৌড়ি করেছেন। আপনার চোখে তো তাদের কোনো অস্তিত্বই নেই আপনার জীবনে। সারাদিন শুধু স্বপ্ন দেখেন, চিন্তা করেন অরণ্যকে, সেই অরণ্য যে আর ফিরে আসবে না। রুঢ় কণ্ঠে কথাগুলো বলে রিয়াদ।
চুপ! চিৎকার করে ওঠে লাবণ্য, তুই কে আমার অরণ্যের ব্যাপারে বলার? লাবণ্যের মনে হয় ও জ্ঞান হারাবে। সবাই ততক্ষণে ছাদে চলে এসেছে। লাবণ্য অসুস্থ রোগীর মতো কাঁপতে থাকে, মা ওকে যেতে বল, ওকে যেতে বল।
আমি যাব না, কী করবেন আপনি? সত্য না জেনে আপনি আরও অসুস্থ হতে থাকবেন তখন আর স্বপ্ন জগৎ থেকে আপনাকে বের করে আনা সম্ভব হবে না। অরণ্য আর নেই। হি ইজ ডেড। সে আত্মহত্যা করেছে, কারণ সে আপনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসত!
লাবণ্য অনেক কষ্টে মুখ তুলে আকাশের দিকে তাকায় চিৎকার করে ওঠে। আমার অরণ্য কাপুরুষ নয় ও কেন করবে আত্মহত্যা? শুধু এই কথাটাই বলে লাবণ্য। তারপর আর কিছু বলে না, জ্ঞান হারায় না, কান্না করে না, চুপচাপ ঘরে গিয়ে ভেজা কাপড়ে বসে থাকে।
এক মাস পর লাবণ্য একটু স্বাভাবিক হয়, তখনই ও অনেক কষ্টে ছোট আপার নতুন ঠিকানা জোগাড় করে তার বাসায় যায়। দরজা খুলে ছোট আপা ওকে জড়িয়ে ধরে। ও বুঝতে পারে ছোট আপা কাঁদছে। ও কাঁদতে পারে না, একদমই পারে না। ঘরে ঢুকে লাবণ্য ছোট করে জানতে চায়,
যা শুনেছি তা কি সত্যি?
ছোট আপা উত্তর দেয় না, চুপ করে থাকে।
বড় করে শ্বাস নেয় লাবণ্য, জানো আপু আমার না বিশ্বাস হয় না, মনে হয় অরণ্য বেঁচে আছে। বাতাসে আমি ওর গন্ধ পাই, ওর নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাই। তুমি পাও না? ও ছোট আপুর হাত ধরে ঝাঁকায়। কী যন্ত্রণা, আপু কী যন্ত্রণা আর কাঁদতে পারি না, চোখে পানি আসে না, কষ্টে রাত্রে উঠে বসে থাকি। আমি কেন তখন অসুস্থ হলাম? আমার কেন এমন হল? আমি তো অরণ্যকে কিছু বলতে পারলাম না।
আপু ওর কাঁধে হাত রাখে। লাবণ্য শান্ত হও। তুমি যখন খুব অসুস্থ তখন অরণ্য প্যারোলে কিছু সময়ের জন্য মুক্ত হয়েছিল। তোমাকে দেখতে এসেছিল, তোমার অবস্থা দেখে ও একদম ভেঙে পড়ে। যতক্ষণ ছিল শুধু তোমাকেই দেখেছিল। তুমি ওকে চিনতে পারনি। যাই হোক হাসপাতালে বসেই ও একটা চিঠি লিখেছিল তোমার উদ্দেশে। তুমি বস আমি আনছি।
লাবণ্য অবাক হয়ে ভাবে ও অরণ্যকে চিনতে পারেনি! অরণ্য এসেছিল! ওর তো মরে যাওয়া উচিত। লাবণ্য আরও অবাক হয়ে দেখে যে ও বেঁচে আছে!
এর পর প্রায় প্রতিদিন টানা ছয় মাস লাবণ্য ওই চিঠি পড়েছে। অরণ্যের শেষ চিঠি। চিঠিটা ওকে বাঁচতে শেখায়, লাবণ্য ধীরে ধীরে মেনে নেয় যে ওর অরণ্য নেই। চিঠিটা লাবণ্য নষ্ট করে ফেলেছে ওর বিয়ের দিন কিন্তু চিঠির প্রতিটা অক্ষর, লাইন ওর মুখস্থ।
লাবণ্য,
পৃথিবীতে কত আজব ব্যাপার ঘটে তাই না। তার মধ্যে একটা হল তোমার আমার দেখা হওয়া, ভালোবাসা এক চিরস্থায়ী বিচ্ছেদ। আমি তোমাকে ভালোবাসি জানি, কিন্তু তা এত বেশি তা জানতাম না। প্রতিদিন আমার কতটা কষ্টে যাচ্ছে তা তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না। আর তুমি! জানি না নিজে কী বলব, ভাগ্যবান নাকি হতভাগ্য! তোমার ভালোবাসার সম্পর্কটা না দেখেই…। এত ভালো কেন বাসলে আমাকে? আমি আজ তোমাকে দেখে কষ্টে লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছি। আমার ভালোবাসা একি অবস্থা করেছে তোমার! একটা কথা বলব, শুনবে তুমি? তুমি অন্য জগতে চলে যাও, স্বপ্ন দেখার, স্বপ্ন নিয়ে বাঁচার জগতে এ রকম অন্ধকার স্বপ্নহীন জগৎ তোমার জন্য নয়। তোমার ডাক্তার রিয়াদ তোমাকে ভালোবাসে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, কত সহজে লিখে দিলাম তাই না? চিঠি লিখার এই তো সুবিধা। আরও সহজ একটা কথা বলি, তুমি রিয়াদকে বিয়ে কর। ভুলে যাও আমাকে না পাওয়ার কষ্ট। রিয়াদ তোমাকে সত্যিই ভালোবাসে, সত্যি! তবে আমার চেয়ে বেশি নয়। লাবণ্য আমার শেষ চাওয়া তোমার সুখ। তুমি রিয়াদের সঙ্গে স্বপ্ন দেখ। শেষবারের মতো, ভালোবাসি তোমায়।
-তোমার অরণ্য…
এরপর লাবণ্য স্বাভাবিক হতে থাকে, ও বুঝতে পারে অরণ্য কেন আত্মহত্যা করেছে। কারণ অরণ্য জানত অরণ্য যতদিন বেঁচে থাকবে লাবণ্য ওকে পাওয়ার আশা ছাড়বে না। এরপর রিয়াদ প্রায় দিনই ওদের বাসায় আসত দেখতে। দেখতে দেখতে ছয়-সাত মাস কেটে যায়। লাবণ্য অরণ্যর কথা মনে করতই না। একদিন বৃষ্টি দেখতে দেখতে লাবণ্যর অরণ্যর কথা হঠাৎই মনে পড়ে যায়। ওর বুকটা শূন্য মনে হয়। এমন সময় রিয়াদ ওদের বাসায় আসে, লাবণ্য বিরক্ত হয়, ওর বলতে ইচ্ছা হয়, কেন আসেন আপনি বারবার? কিন্তু বলতে পারে না।
এই দিক দিয়ে যাচ্ছিলাম, ভাবলাম তোমাকে দেখে যাই, কেমন আছ তুমি?
লাবণ্য এ প্রশ্ন এড়িয়ে যায়। আপনার জন্য কিছু আনব?
চা হলে ভালো হয়। আঙ্কেল-আন্টি কোথায়?
নেই।
তুমি এত কম কথা বল কেন?
লাবণ্য উত্তর দেয় না। ধীর পায়ে চা বানাতে যায়। রিয়াদ কি সত্যিই আমাকে ভালোবাসে? কেন? অরণ্য কীভাবে একদিন দেখেই বুঝে গেল? জানালা দিয়ে ও আকাশের দিকে তাকায়, কতক্ষণ যে তাকিয়ে থাকে লাবণ্য বুঝতে পারে না। হঠাৎ ও অনুভব করে গরম কিছু ওকে স্পর্শ করছে, ফিরে তাকিয়ে দেখে ওর জামায় আগুন।
লাবণ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আগুন দেখে, আগুন হাঁ করে যেন ওকে গ্রাস করতে আসছে। ও চিৎকার করে ওঠে অরণ্য! বাঁচাও! ড্রইং রুম থেকে তৎক্ষণাৎ দৌড়ে আসে রিয়াদ। প্রথমে হতভম্ব হয়ে যায়। কিন্তু। ততক্ষণে আগুন ওর জামা স্পর্শ করে ফেলেছে। ওই হাতে রান্নাঘরে রাখা কলসি ভর্তি পানি ওর গায়ে ঢেলে দেয়।
প্রচণ্ড রাগে রিয়াদ ওর দিকে তাকায়, প্রায় খেঁকিয়ে ওঠে, মন কোন দিকে থাকে?
কোনো দিকে না। লাবণ্য বিরক্ত হয়।
বিরক্ত হবে না খবরদার! তোমার মতো পাগল আমি বহুত দেখেছি, আজ যদি কিছু হতো তোমার!
কী হতো? মারা যেতাম।
মৃত্যু এত সহজ না। এক মৃত্যুর পরিণাম দেখছ তুমি? তুমি মরে গেলে তোমার বাবা-মার কী হবে? তারপর চিৎকার করে ওঠে, আমার কী হবে? অরণ্যকে হারিয়ে তোমার যে অবস্থা হয়েছে, তুমি কি চাও আমারও তাই হোক?
লাবণ্য উত্তর দেয় না, ওর উত্তর দিতে ইচ্ছা হয় না। রিয়াদের হাত পুড়ে গেছে ও দেখতে পায় কিন্তু ওর ইচ্ছা হয় না রিয়াদের হাতে কিছু করে দিতে। ও শান্ত কণ্ঠে বলে, চলে যান। দরজা ওই দিকে। কী মনে করেন আপনি নিজেকে, যা মুখে আসবে তাই বলবেন আপনি। আমি আপনাকে ভালোবাসি না। আমি তো আপনাকে ডাক দিইনি। বের হয়ে যান।
এরপর আরও তিন মাস কেটে যায়। রিয়াদ এর মাঝে একদিনও আসে না। লাবণ্য নিজে যথেষ্ট সামলে নেয়। একটা স্কুলে পার্টটাইম চাকরি নেয়। পড়ালেখা শুরু করে। তবে প্রায় ওর মনে হতো রিয়াদের সঙ্গে যথেষ্ট রুঢ় আচরণ করে ফেলেছে। আরও কিছুদিন পর ওর বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে যায়। হার্টে ব্লক হয়। হাসপাতালে যাওয়া-আসা করতে করতে একদিন লাবণ্য মুখোমুখি হয় রিয়াদের। রিয়াদ যথেষ্ট ভালো ব্যবহার করে ওর সঙ্গে। ওর বাবার সব ব্যাপারে সাহায্য করে, কম খরচে অপারেশনের ব্যবস্থা নেয়। এত দিন দায়িত্ব সম্পর্কে সম্পূর্ণ অচেতন লাবণ্য অনুভব করে বাবা-মার প্রতি ওর করার অনেক কিছু আছে। বাবার অপারেশনের দিন লাবণ্য অনেক ভাবে, ভেবে দেখে ওর জীবনের ভালোবাসা ও বেসে ফেলেছে, কিন্তু রিয়াদ তো ওকে ভালবাসে, ও যদি রিয়াদের সঙ্গে বিয়ে করে তাহলে ভালোবাসতে না পারুক একজন সঙ্গী তো পাবে। একাকী জীবন আর বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাসে ও ক্লান্ত হয়ে যায়।
এর প্রায় চার মাস পর ওর আর রিয়াদের বিয়ে হয়ে যায়। তবে রিয়াদকে লাবণ্য ভালোবেসেছে, এত ভালোবেসেছে যে ভুলে গেছে পেছনের সব। এই ভালোবাসার জন্ম হয় বিয়ের পর কিন্তু ওর এই ভালোবাসাটাই এখন ওর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। ওর এই নতুন জীবনে ও খুব সুখী আর তৃপ্ত। তবুও আজ পেপারের ছোট একটা খবর ওর জগৎটাই উল্টে-পাল্টে দেয়। আসামিদের জীবন নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন ছাপছিল পত্রিকাটি। প্রতিদিন লাবণ্য এই প্রতিবেদনটি পড়ে। আজ জেলের চিকিৎসা ব্যবস্থা আর আসামিদের বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর বিষয়ে লেখা ছিল।
খবরটা তেমন কিছু নয় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এক আসামির ডেঙ্গু জ্বরে মৃত্যু হয়েছে সম্প্রতি, এই খবরের সঙ্গে আরও কয়েক জনের মৃত্যুর খবর যারা ডেঙ্গু জ্বরে মারা গেছেন। কিন্তু আসামির নাম ও সাজাপ্রাপ্তের কারণ সম্পর্কে পড়ে লাবণ্য নিশ্চিত হয় যে এটা অরণ্যই। তার মানে অরণ্যর যাবজ্জীবন সাজা হয়েছিল ও আত্মহত্যা করেনি। লাবণ্য থানায় ফোন করে নিশ্চিত হয়। লাবণ্য মেনে নিতে পারে না, কান্না থামিয়ে উঠে দাঁড়ায়। রাস্তায় বের হয়ে হাতে ধরা ঠিকানা দেখে ট্যাক্সি ক্যাবে উঠে বসে। বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। লাবণ্য পাথরের মতো হয়ে যায়। আর মনে চলতে থাকে প্রশ্নের তুফান।
ছোট আপি দরজা খুলে অবাক হয়ে তাকায়, কত বছর পর! প্রায় এগার বছর পর লাবণ্যর মুখোমুখি দাঁড়ায় ছোট আপি। পেছনে এসে দাঁড়ায় অরণ্যর ভাগ্নে রিফাত, ছোট আপা বলে, লাবণ্য আস ভেতরে আস।
লাবণ্য ভেতরে আসে, চারপাশে তাকায় ওই তো দেয়ালে অরণ্যর ছবি টানানো, লাবণ্যর চোখের সামনে ভেসে ওঠে প্রথম দেখার সেই অরণ্য, কী বলবে, কীভাবে বলবে লাবণ্য বুঝে না। ছোট আপির মুখোমুখি বসে শুধু একটা প্রশ্নই করে, যা শুনেছি তা কি সত্যি?
ছোট আপি বলে, তোমার মেয়ের খবর কী? তুমি তো আমার খবর রাখনি আমি ঠিকই তোমার খবর রাখি।
অরণ্য জানত আমার কথা তাই না? ও জানতে চাইত দেখেই তো আপনি আমার খবর নিতেন। চৌদ্দ শিকের ভেতরের মানুষটা আমার ছোট ছোট সুখের খবরে আনন্দিত হতো। অথচ এই এতগুলো বছর বেঁচে থেকেও অরণ্য আমার কাছে মৃত হয়ে রইল।
অন্য জগতে আমি সুখে রইলাম আর ও এতটা বছর…। কথা শেষ করতে পারে না লাবণ্য কেঁদে ওঠে। নিজেকে সামলে নিয়ে তাকায় ছোট আপির দিকে, কেন মিথ্যা বললেন, কেন আমার জীবনটা অন্য রকম করে দিলেন কেন?
… আমরা যা করেছি তা তোমার ভালোর জন্যই করেছি।
আমার ভালো! আমাকে না জানিয়ে!…
লাবণ্য সত্য জানার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তুমি সুখী ছিলে, তাই না? তোমার জীবনটা কেমন হতো ভেবেছ একবার, যদি তুমি এই সুন্দর সংসারটা না পেতে, যদি অরণ্যর আশায় জীবনটা এভাবেই শেষ করতে। তুমি হয়তো তা করতে কিন্তু অরণ্য তো হতে দিতে পারত না।
অরণ্য কীভাবে এমন মিথ্যা অভিনয় করল আপি? আমাকে না দেখে ও কীভাবে এতটা বছর পার করল? আমি জানতাম ও নেই কিন্তু ও তো জানত আমি আছি।
লাবণ্য তোমাকে দেখতে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই ওর যাবজ্জীবন সাজা হয়। তোমাকে দেখতে গিয়ে ডাক্তার রিয়াদের সব কিছুতে অরণ্য তোমার প্রতি ডা. রিয়াদের সীমাহীন ভালোবাসা আবিষ্কার করে। তারপর ও ঠিক করে ও কী করবে। অরণ্য অনেক কষ্টে ডা. রিয়াদকে রাজি করায়। তাই সেই ভালো মানুষটাকে ভুল বুঝ না তুমি। তখনই অরণ্য চিঠি লেখে। আমাকে বলে কী করতে হবে। ব্যাপারটা অরণ্যর জন্য সহজ ছিল না দশ-এগার বছর তোমাকে ছাড়া ও ছটফট করেছে। কিন্তু তুমি সুখে আছ ভেবে ও সব কষ্ট সহ্য করেছে। লাবণ্য এত বছর পর এসব চিন্তা কর না সুখে থাক তুমি।
আমি সুখে আছি, সুখে থাকব কারণ অরণ্যর সেই ভালোবাসা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছি। চিঠি আছে? আমার জন্য? আমি জানি অরণ্য যাওয়ার আগে আমার জন্য কিছু না কিছু রেখে গেছে।
আপি উঠে দাঁড়ায়, হ্যাঁ হাসপাতালে থাকার সময় ও একটা চিঠি লিখেছিল। ভেবেছিলাম তোমাকে দেব না, কিন্তু… তুমি বস আমি আনছি।
আজ যেন আকাশ ভেঙে পড়ছে, বৃষ্টির কোনো বিরাম নেই। বহু বছর পর লাবণ্য আজ আবার বৃষ্টিতে ভিজতে লাগল। চোখ বেয়ে পানি পড়ছে কেউ তা দেখছে না কী মজা! বেইলি রোডের চিরচেনা সেই রাস্তার পাশে বসে পড়ল লাবণ্য ছাতাটা মাথার উপর ধরল, তারপর খুলে সামনে ধরল চিঠিটা
লাবণ্য,
তুমি কি কোনোদিন সত্য জানতে পারবে? যদি জানতে পার তাহলে তুমি কী করবে? জানি অভিমান, অভিযোগ আর রাগে তুমি অন্ধ হয়ে যাবে। তখন তোমাকে দেখতে কেমন লাগবে, কে জানে? তোমাকে শেষ দেখার মুহূর্তটাকে সম্বল করে এত দিন বেঁচে ছিলাম, মশা কামড়ে ভালোই করেছে। না হলে শাস্তি শেষ হওয়ার পর মুক্তি পেতাম কিন্তু তোমাকে তো পেতাম না এমনকি দেখতেও পারতাম না, কারণ এখন তুমি অন্য কারও। আমি মনে হয় এ যাত্রায় মরেই যাব, ভালোই হবে, হাসপাতালে শুয়ে ছটফট করতে করতে প্রায় তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছা হয় কেমন এক শূন্য শূন্য অনুভূতি।
আমিও তো মানুষ, নিজেকে সামলাতে খুব কষ্ট হয়। খুব কষ্ট হলে পুরনো কথা মনে করি, আমার লাবণ্যর সঙ্গে কথা বলি, এখনকার যে লাবণ্য, তাকে তো আমি চিনি না। এ চিঠি তুমি পাবে না, তবুও কেন যেন মনে হচ্ছে চিঠিটা তুমি পড়বে, কীভাবে তা জানি না। আমার মৃত্যুর খবর আবার তোমাকে কে দেবে বল তো? আজ বড় ইচ্ছা করছে…। তাই তোমাকে নিজের করে পাওয়ার স্বপ্নও দেখি না।
-অরণ্য।
বৃষ্টির ঝিরঝির শব্দ ছাপিয়ে লাবণ্যর কান্না আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হল। লাবণ্য বিড়বিড় করল- কেন অরণ্য, কেন? এই এক সপ্তাহ আগেও এ পৃথিবীতে তুমি ছিলে আমি তোমাকে দেখতে পারলাম না। তুমি কেন এমন করলে? না হয় তোমার অপেক্ষা করতাম আমি, তুমি ফিরে এলে আবার নতুন করে সব শুরু করতাম। এতটা কষ্ট পেয়ে মৃত্যু তো তোমার প্রাপ্য ছিল না। আমি এতটা বছর সুখে কাটিয়ে দিলাম, জীবনে সব…। আর তুমি আমার জীবনে সুখ এনে দিয়ে নিজে তিলে তিলে শেষ হয়ে গেলে। কী এমন ক্ষতি হতো যদি তুমি এ অভিনয় না করতে। লাবণ্য বসে বসে ভিজতে থাকে, আজ সব জমে থাকা কষ্ট, কান্না সে বৃষ্টির কাছে জলাঞ্জলি দিতে চায়।
লেখক : সাহিত্যিক

(Visited 233 times, 1 visits today)

Related Post

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *